স্বামীর নাম গ্রহণে আজও নারীরা কেন আগ্রহী?

স্বামীর নাম গ্রহণে আজও নারীরা কেন আগ্রহী?

ইমতিয়াজ আহমেদ মাহবুব (২৮)। পেশায় একজন উকিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নকালে সহপাঠিনী অনিকা তাসনিমের (২৯) সাথে বন্ধুত্ব। কিন্তু এই বন্ধুত্ব কখন যে প্রেমে পরিণত হয়েছে তা কেউই টের পায় নি। তাই প্রণয়কে পরিণয়ে রূপ দিতে দুজনেই বদ্ধপরিকর। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার পর অনিকা নিজের নামের সাথে তার স্বামীর নামের শেষ অংশ ‘মাহবুব’ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলে আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেন ইমতিয়াজ আহমেদ। এলিজাবেথ ইসাবেলা (৩০)। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নেহাতই বিয়েটা পিছিয়ে গিয়েছিলো।

এ বছর জুলাই মাসে তিনি এডাম জনসনের (৩২) সাথে বিয়ে সম্পন্ন করেন। তারা দুজনে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতে যৌথভাবে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনা করছেন। এই বিয়ের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে ইসাবেলা তার প্রেমিকের নামের শেষাংশ গ্রহণ করতে পেরে অনেক আনন্দিত। ঘটনা দুটিই বাস্তব। শুধু গোপনীয়তার স্বার্থে স্থান, কাল, পাত্র পরিবর্তন করা হয়েছে।

স্বামীর নাম গ্রহণে আজও নারীরা কেন আগ্রহী?এখানে লক্ষণীয় যে, উভয় ঘটনায় উল্লেখিত কাপলরা আধুনিক যুগের নাগরিক। যখন নারীবাদ প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে অত্যন্ত সরব, যখন মেয়েরা তাদের নিজেদের অধিকার রক্ষায় যথেষ্ট সচেতন, তখনও তারা স্বেচ্ছায় তাদের স্বামীদের নাম গ্রহণ করতে আগ্রহী। আক্ষরিক অর্থেই স্বামীর নাম গ্রহণ তীব্র পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার একটি উপাদান। পিউ রিসার্চের নারীবাদ বিষয়ক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়েই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার মাধ্যমে তাদের স্বামীর নাম গ্রহণ করে থাকেন। আর গ্রেট ব্রিটেনে তো সংখ্যাটি আরও বড়।

স্বামীর নাম গ্রহণে আজও নারীরা কেন আগ্রহী?শতকরা প্রায় ৯০ শতাংশ ব্রিটিশ মেয়েরাই বিয়ের পর তাদের স্বামীর নাম গ্রহণ করে থাকেন। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ৭৫ শতাংশ নারীদের বয়সই ১৮ থেকে ৩০। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নারীবাদের সংজ্ঞায়নের তারতম্যই হলো এই দু’দেশের কিছুটা পার্থক্যের কারন। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে, যেসব মেয়েদের বয়স এখনো ৩০ এর কম, তাদের ভেতর শতকরা ৬৮ এবং ৬০ ভাগ নারীরা নিজেদেরকে নারীবাদী বলে দাবি করেন। যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিমন ডানকানের বক্তব্য অনুযায়ী, “বর্তমান যুগে এসেও স্বামীর নাম গ্রহণের প্রতি নারীদের এতটা আগ্রহ সত্যিই আশ্চর্যজনক। স্বামীর নাম গ্রহণের চর্চাটি মূলত এই ধারণাকেই সমর্থন যোগায় যে, বিয়ের পর একজন স্বামী তার স্ত্রীকে অধিকৃত করে নেয়।

দখলদারিত্বমূলক মনোভাব ছাড়া এটি আর কিছুই হতে পারে না। বিয়ের মাধ্যমে নিজের স্ত্রীকে অধিকৃত করার যেই ধারণা সেটি বহু আগেই বিলুপ্ত হলেও অধিকাংশ ইংরেজি ভাষাভাষী লোকেদের দেশগুলোতে বৈবাহিক নাম পাল্টে নেওয়ার রেওয়াজটি এখনও বিদ্যমান।” ইউরোপের তিনটি দেশ যথা: গ্রিস, আইসল্যান্ড ও স্পেন বাদে প্রায় অধিকাংশ দেশের নারীদের ক্ষেত্রেই বিয়ের পর স্বামীর নাম গ্রহণ করা একটা রীতি। নরওয়ে, যে দেশটি পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধী এবং লিঙ্গ সমতার স্বর্গরাজ্য বলে পরিচিত, সেই দেশেও অধিকাংশ নারীরাই বিয়ের পর তার স্বামীর নাম গ্রহণ করে থাকেন। বর্তমানে, নারীরা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই নিজেদের উপভোগ করতে সর্বদা সচেতন থাকলেও, এক্ষেত্রে তারা কেনো স্বনির্ভর আচরণ প্রদর্শন করছেন না? সিমন ডানকান ও তার সহকর্মীদের গবেষণা অনুযায়ী, দুটি বিষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।

স্বামীর নাম গ্রহণে আজও নারীরা কেন আগ্রহী?প্রাথমিকভাবে তাদের গবেষণা অনুযায়ী, বিভিন্ন কারণে মেয়েরা নাম পরিবর্তন করার ইচ্ছা পোষণ করতে পারেন। যার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি পারিবারিক নাম অর্জন করেছেন, হতে পারেন তিনি মৃত; কিংবা একজন সহিংস ব্যক্তি; কিংবা স্রেফ তার নামের ঐ অংশটি পছন্দ নয়। প্রকৃতপক্ষে, কারণগুলো তাদের একান্ত ব্যক্তিগত ও গুরুত্বের দিক থেকে লঘু। মেয়েদের এ আচরণের পেছনে প্রণিধানযোগ্য দুটি কারণ রয়েছে। প্রথম কারণটি হচ্ছে, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বলিষ্ঠ উপস্থিতি।

এখানে আসলে, বিবাহিত যূগলটি নিজেরা পুরুষতান্ত্রিক কি না তা কোনো ভূমিকা রাখে না। তারা স্রেফ এই প্রথার অনুসারী এবং বুঝে হোক বা না বুঝেই হোক তারা নিজেরাও একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি করে আসছেন এভাবে। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, মেয়েরা এই কাজটি করে থাকেন একজন সুযোগ্য স্ত্রী ও দায়িত্ববান মা হওয়ার স্বপ্ন থেকে। মূলত মেয়েরা স্বামীর প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশ করে থাকেন স্বামীর নাম গ্রহণের মাধ্যমে।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বামীর নামগ্রহণ এটিই বলে যে, একজন নারী তার পরিবারকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে আগ্রহী। যদি কোনো মেয়ে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে এই যুক্তি দেখান যে, বিয়ের পরেও তিনি নিজের নামেই পরিচিত হতে চান, নামের মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের একটি মৌলিক দিককে তিনি স্বামীর নামের সাথে মিশিয়ে ফেলতে চান না, সেক্ষেত্রেও তাকে বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়।
ইউরোপের দেশগুলোতে প্রচলিত এই প্রথার বিরোধিতা করলে স্বামীর জবাব থাকে যে, তাহলে বিয়ের উদ্দেশ্যটাই তো পূর্ণ হচ্ছে না!

স্বামীর নাম গ্রহণে আজও নারীরা কেন আগ্রহী?এই ধরনের স্বামীদের কাছে এই প্রথা এতটাই জরুরি যে তা না মানলে বিয়ে না করার শামিল করছেন। আরেকটি বিষয়ে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত বলে মনে হচ্ছে। নারীবাদের ঝাণ্ডাধারী দেশগুলোতে অনুষ্ঠিত সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র, টিভি সিরিজ ইত্যাদিতে যখন একজন মেয়েকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েটি তার নিজের নাম এবং পেশার পাশাপাশি তিনি বিবাহিত হলে কার স্ত্রী, সেটা বাধ্যতামূলকভাবে উচ্চারিত হয়ে থাকে।

কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে কখনো এতটা নিয়ম মেনে ঘোষণা করার নজির পাওয়া যায় নি যে, তিনি কার স্বামী? এখানে স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে ব্যক্তি হিসেবে; একজন একক, স্বাধীন, মানুষ হিসেবে; একটি মৌলিক সত্ত্বা হিসেবে নারীরা পরিচিত হন না সমাজে। একজন মেয়ে- হতে পারেন তিনি একজন আমলা, শিক্ষক, পরিচ্ছন্নকর্মী, দোকানদার বা যে-ই হোন না কেন, বিবাহিত হলে তিনি কার স্ত্রী, বিষয়টি উল্লেখ করা একান্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বটে।

নারীবাদীদের মাঝে অনেকেই অবশ্য নাম পরিবর্তনের বিষয়টিকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখে থাকেন। নারীর স্বাধীনতা হচ্ছে নারীবাদের ভিত্তি। একজন নারী যদি স্বেচ্ছায়, ভালোবেসে স্বামীর নাম গ্রহণ করে থাকেন তাহলে এটি তার ব্যক্তি স্বাধীনতা। এই চর্চাটি পুরুষতান্ত্রিকতার সমর্থন যোগাচ্ছে নাকি এর প্রতিবাদ করছে, সেটি মুখ্য বিষয় না।

Thank You for Visit.

Leave a Comment