পজিটিভ প্যারেন্টিং কতটা পজিটিভ?

পজিটিভ প্যারেন্টিং কতটা পজিটিভ?

 

পশ্চিমা সংস্কৃতিতে সন্তানদের সাথে বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থেকে আমাদের উপমহাদেশের অনেকজনকে প্রায়ই আক্ষেপ করতে দেখা যায়। আমাদের সংস্কৃতিতে বাবা যেন যুগ যুগান্তরে এক ভয়ংকর, বদমেজাজি এক পুরুষ আর অন্যদিকে এক চিরকালীন আত্মত্যাগী নারীর পরিচায়ক। কোনো বাঙালি পরিবার একটি একক সত্ত্বা হিসেবে একই সমতলে আসতে পেরেছে, এই ধরনের দৃষ্টান্ত খুব একটা দেখা যায় না। তবে ইদানিং এ ধারা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। বিষয়টি অবশ্যই অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে সামগ্রিকভাবে পজিটিভ প্যারেন্টিং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পজিটিভ থাকতে ব্যর্থ হচ্ছে।

পজিটিভ প্যারেন্টিং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মা এবং সন্তান উভয়ের জন্যই নেগেটিভ ফলাফল বয়ে আনছে। অভিভাবক হিসেবে সন্তানদের সাথে ভালো সম্পর্ক এবং বোঝাপড়া বজায় রাখা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা সন্তানের সাথে যে ধরনের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া যতটা ইতিবাচক, এগুলোর উপর নির্ভর করে সন্তানরা ততটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকে এবং মানুষের সাথে মেলামেশায় কতটা উদারপন্থী আচরণ করে থাকে। বর্তমানে যারা সন্তান গ্রহণ করছেন, সাধারণত তারা বাচ্চাদের সাথে যোগাযোগের সময় চিৎকার, ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদি নেতিবাচক আচরণগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন।

পজিটিভ প্যারেন্টিং কতটা পজিটিভ?পজিটিভ প্যারেন্টিং যেভাবে সন্তানদের জীবনে ক্ষেত্রবিশেষে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েই এ আলোচনা। সন্তানের নিজস্ব জীবনে ব্যর্থতা কখনো কখনো পজিটিভ প্যারেন্টিং এর সীমানা নির্ধারণে ব্যর্থ হয়ে থাকে। বাবা-মা তাদের সন্তানদেরকে নিরন্তর উৎসাহ দিতে গিয়ে কখনো কখনো এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে, তারা ভুলেই যান যে পৃথিবীতে তারা চিরকাল বেঁচে থাকবেন‌ না। শিশুরা ছোটবেলা থেকে নিজেদের ব্যর্থতাকে বুঝতে না পারলে, নিজেদের ভুলগুলো না বুঝতে শিখলে, তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে, ভবিষ্যতে এটি তাদের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ মাত্রই ভুল। ভুল মানুষের জীবনেরই অংশ।

কিন্তু সে কখনো ভুলের উর্ধ্বে নয়। তাই সচেতন বাবা-মা হিসেবে ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া এবং তাদের ব্যর্থতাকে স্বীকার করার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তাদের একান্ত কর্তব্য। বাবা-মা হিসেবে অনেকের ধারণা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়ে গিয়েছে যে তারা যত কষ্টেই থাকুন না কেনো, তাদের মন খারাপ, দুশ্চিন্তা, অবসাদ ইত্যাদি তাদের সন্তানের সামনে কখনোই প্রকাশ করেন না। বরং সবসময় তাদের সামনে হাসিমুখে থাকেন। তাদের ধারণা অনুযায়ী, তাদের নেতিবাচক অনুভূতিগুলোর বহিঃপ্রকাশ হয়তো তাদের সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পজিটিভ প্যারেন্টিং কতটা পজিটিভ?কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এমন হওয়া উচিত নয়। নিজের জীবনের ভুল-ত্রুটি, ব্যর্থতা, নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ইত্যাদি সন্তানদের কাছে খোলামেলাভাবে আলোচনা করলে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অর্জন করে। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনই সফলতা আর ব্যর্থতার সমষ্টি। অভিভাবকদের ভুল, কষ্ট, সংগ্রাম, আক্ষেপ, দূর্বলতা, ব্যর্থতা, বিষণ্নতা ইত্যাদি নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো তাদের সন্তানদেরকে জীবনের সামগ্রিকতা সম্পর্কে বার্তা প্রদান করে। ফলে, তারা আস্তে আস্তে তাদের অজান্তেই তাদের জীবনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব বুঝে নিতে পারে। এখানে আরও একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, সন্তানকে তার বয়স অনুযায়ী প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে হবে।

সন্তানের বয়স যদি একেবারেই কম হয়ে থাকে, তাহলে তার সামনে বাবা-মায়ের নিজেদের নেতিবাচক অনুভূতিগুলো খুব প্রগাঢ়ভাবে প্রকাশ করা উচিত হবে না। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের প্রতি তার শিশুকালের অতি কোমলতা এবং আদুরে মনোভাব বজায় রাখাও উচিত নয়। কারন, এর ফলে সে পৃথিবীর বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে না। আরও উল্লেখযোগ্য দিকটি হচ্ছে, যেসব মায়েরা নিজেদেরকে পরিবারের জন্য সাংসারিক জীবনে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করে থাকেন, তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে ক্লান্তির জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের অসন্তুষ্টিতে ভুগে থাকেন।

তাদের এই ভূমিকাকে গবেষণার ভাষায় অদৃশ্য পরিশ্রম বলে। অর্থাৎ পজিটিভ প্যারেন্টিং সন্তানদের পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে মায়ের জন্যেও নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনে। মা-বাবাদের যত্ন-আত্তি বাবা-মায়ের জীবনের নানা দিক সন্তান লালন-পালনের জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত। অভিভাবকদের বাস করা সংস্কৃতি, তাদের কর্মক্ষেত্র, আর্থিক অবস্থা, ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক চাপ, হতাশা ইত্যাদি অনেক বাঁধা পার করে পজিটিভ প্যারেন্টিং সত্যিকার অর্থেই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সন্তানদের সাথে একটি সুস্থ, বন্ধুত্বপূর্ণ, ইতিবাচক, নিভর্রশীল সম্পর্ক স্থাপন করে তা চালিয়ে যাওয়া অভিভাবকদের জন্যেও অনেক কঠিন ব্যাপার বটে।

যখন পজিটিভ প্যারেন্টিং এর দোহাই দিয়ে বাবা-মাকে বার বার তাদের ভুলগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাদের জন্য পজিটিভ প্যারেন্টিং একটি বোঝা হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, পজিটিভ প্যারেন্টিং অবস্থা বিবেচনায় বাবা-মায়ের জন্যেও ভয়ংকর হতে পারে। সার্বক্ষণিক প্রশংসা এক সময় অথরিটারিয়ান (কর্তৃত্ববাদী) প্যারেন্টিং অনেক জনপ্রিয় ছিলো। অর্থাৎ, বাবা-মা সবসময় সন্তানদের জীবনে শাসনকারীর ভূমিকা পালন করতেন। ছেলে-মেয়েরা তখন শাস্তি, পরামর্শ, আদেশ, নিষেধ ইত্যাদির মাধ্যমে বড় হয়ে উঠতো। তারপর আসলো পারমিসিভ (অনুমোদন) প্যারেন্টিং। এই ধরনের প্যারেন্টিং-এও তুমুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি কিছু ক্ষতিকর দিকও আছে।

ছেলে-মেয়েদেরকে সকল বিষয়ে লাগামহীনভাবে উৎসাহ প্রদান করতে থাকলে, পরবর্তীতে তা তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।তুমুল প্রশংসা শিশুকে সমালোচনার উপর দূর্বল করে তোলে। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর, শিশুটি যখন বাস্তব পৃথিবীর মুখোমুখি হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সকলেই তার শুভাকাঙ্ক্ষী হবে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাকে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার মোকাবেলা করতে হবে। তখন সে নিজের ভুল এবং ব্যর্থতা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত জানতে থাকবে। তখন শৈশবে সে যদি তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে শুধুমাত্র প্রশংসা পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে থাকে, তাহলে পৃথিবীর বাস্তবতায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হবে।পজিটিভ প্যারেন্টিং কতটা পজিটিভ?

তাহলে কি অথরিটারিয়ান প্যারেন্টিং এবং পারমিসিভ প্যারেন্টিং উভয়ই বর্জনীয়? গবেষণা অনুযায়ী, যদি নেতিবাচক মন্তব্যের তুলনায় ইতিবাচক মন্তব্য চারগুণ বেশি প্রদান করা হয়, তাহলে সেটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। তবে, ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের মন্তব্যই যেনো যুক্তিপূর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ, সন্তান যদি সত্যিই প্রশংসার যোগ্য দাবিদার হয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য যথার্থ প্রশংসনীয় মন্তব্য প্রদান করতে হবে। নেতিবাচক মন্তব্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অযথা বকাঝকা ও শাসন করার জন্য নয়, তার ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং তাকে সচেতন করার জন্যেই শুধুমাত্র নেতিবাচক মন্তব্য প্রদান করতে হবে।

মানসিক বৃদ্ধির সময়, যদি সমালোচনার থেকে তুলনামূলক প্রশংসা বেশি করলে, তা পরবর্তী জীবনে সন্তানের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। ইতিবাচক অনুভূতি সন্তানকে মানুষ হিসেবে আত্মপ্রত্যয়ী, আন্তরিক ও মিশুক করে তোলে। অপরদিকে নেতিবাচক অনুভূতি তার দূরদর্শিতা, পরিকল্পনা, চিন্তন দক্ষতা ইত্যাদি বৃদ্ধিতে সহায়ক। বাবা-মায়ের আদর এবং শাসনে প্রতিটি সন্তান গড়ে উঠুক – একজন সম্ভাবনাময় মানুষ হিসেবে।

 Thanks for Visit.

Leave a Comment