কেওক্রাডং : এক রূপকথার পাহাড়

কেওক্রাডং : এক রূপকথার পাহাড়

 

রূপকথার গল্পে যেভাবে পাহাড়ের সৌন্দর্যের বিবরণ পাওয়া যায়, ঠিক তেমনই কেওক্রাডং হলো একটি রূপকথার পাহাড়। বাংলাদেশের সবথেকে সুন্দর পাহাড়গুলোর মধ্যে কেওক্রাডং অন্যতম এবং সবচেয়ে সুন্দর পাহাড়ি পথগুলোর একটি এই পথ। উচ্চতার হিসাবে এটি বাংলাদেশের পঞ্চম সর্বোচ্চ চূড়া, যার উচ্চতা ৩২৩৫ ফুট।

বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হলো সাকা হাফং বা মদক তং, যার উচ্চতা ৩৪৬৫ ফুট‌। তবে সৌন্দর্যের দিক থেকে অন্য সব পাহাড়গুলোর তুলনায় কেওক্রাডং অনেক এগিয়ে। এ যেন এক গ্রিন হেভেন! খুব ভোরবেলা আমরা বান্দরবান পৌঁছালাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো বগালেক হয়ে কেওক্রাডং যাওয়া।কেওক্রাডং : এক রূপকথার পাহাড়

চান্দের গাড়িতে করে আমরা রওনা দিলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আঁকা বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলো চান্দের গাড়ি আর আমরা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে শুরু করি। বান্দরবান শহর থেকে বাসে বা চান্দের গাড়িতে রুমা বাজার যেতে হয়। যাবার পথে এনআইডি কার্ড এবং পরিচয়পত্র অবশ্যই সাথে রাখতে হবে‌।

প্রতিটি চেকপোস্ট এন্ট্রি করে যেতে হয়। যাবার পথেই পড়ে মিলনছড়ি এবং ওয়াই জাংশন আর্মি চেকপোস্ট। ওয়াই জাংশনের এক মাথা দিয়ে রুমা বাজার এবং আরেক মাথা দিয়ে থানচি যেতে হয়। অবশ্য থানচি দিয়েও কেওক্রাডং যাওয়া যায়। কিন্তু তা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং দূর্গম পথ হওয়ায় বগালেক দিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।

রুমা বাজারে পৌঁছানোর পর এমইএস গেট আর্মি চেকপোস্ট। সেখান থেকে তাদের নিয়োগকৃত স্থানীয় একজন ট্যুরিস্ট গাইড নিতে হয় এবং পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র থেকে অঙ্গীকার নামা সাক্ষর করে নিতে হয়। সব ফর্মালিটি শেষ করে আমরা রওনা দিলাম বগালেকের উদ্দেশ্যে।কেওক্রাডং : এক রূপকথার পাহাড়

অসাধারণ পাহাড়ি রাস্তা, মেঘ আর সবুজ সমারোহের ভেতর দিয়ে যেতে লাগলাম। প্রায় ২ ঘন্টা পর আমরা বগালেক পৌঁছালাম। বগালেক পাড়ার খাবারের স্বাদ অসাধারণ। এখানকার মেন্যুতে আছে ভাত, খিচুড়ি, ডিম ভাজি, সালাদ, আলু ভর্তা, ডাল, পাহাড়ি মুরগি ইত্যাদি। নাস্তা শেষে আমরা একটা কটেজ ভাড়া করলাম। সেখানে আমাদের লাগেজগুলো রেখে শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে কেওক্রাডং ট্রেকিং শুরু করলাম।

ট্রেকিং করতে মোটামুটি ৪/৫ ঘন্টা মতো লাগে। গতির উপর ভিত্তি করে সময় কিছুটা কম বেশি হতে পারে অবশ্য। আগে সম্পূর্ণ ট্রেকিং করে কেওক্রাডং যেতে হতো‌। এখন অবশ্য বগালেক থেকে একদম কেওক্রাডং হয়ে আরও দূর পর্যন্ত পিচঢালা রাস্তা তৈরি হচ্ছে। চাইলে গাড়ি দিয়েও যাওয়া যায়। তবে, ট্রেকিং করেই এর আসল সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

উঁচু নিচু রাস্তা, ঝোপঝাড়, ঝিরি আবার কখনো একদম খাড়া পাহাড় দিয়ে আমরা পথ চলতে থাকলাম। অনেকক্ষণ চলার পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো‌। তখনও আমরা গন্তব্য থেকে অনেকটা দূরে। কিছুক্ষণ পর আমরা দার্জিলিং পাড়ায় পৌঁছালাম। দার্জিলিং পাড়াকে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিষ্কার পাড়া বলা হয়। প্রায় ৩০টির মতো পরিবার থাকে এখানে।

অধিকাংশই বম উপজাতি। অসংখ্য ফুলের বাগান রয়েছে এই পাড়ায়। এখানেও অবশ্য থাকার ব্যবস্থা আছে। অনেকে এখানে রাত্রিযাপন করে পরদিন আবার যাত্রা শুরু করে। কিন্তু এখান থেকে কেওক্রাডং বেশি দূরে না হওয়ায় আমরা এখানে কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের তখনো ১ ঘন্টার পথ বাকি ছিলো।কেওক্রাডং : এক রূপকথার পাহাড়

তবে তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। তখন আমরা সবাই মোবাইলের ফ্ল্যাশ অন করে চলতে থাকলাম। এভাবেই পৌঁছালাম কেওক্রাডং এর পাদদেশে। সামনে তখন একটানা একদম খাড়া পাহাড়। চারপাশে ঝোপঝাড়, বিশাল উঁচু উঁচু গাছ আর পোকাদের ডাক। পরিষ্কার আকাশে তখন হাজারো তারার মেলা। আস্তে আস্তে অনুভব করতে লাগলাম ঠান্ডা বাতাস।

প্রায় ২ ঘন্টা পর অবশেষে পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে, কেওক্রাডং এর চূড়ায়। বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম পাহাড় চূড়া। আর্মি চেকপোস্ট এন্ট্রি করে প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার পর কটেজেগুলোর খোঁজ পেলাম। সবচেয়ে সুন্দর কটেজটি পাহাড়ের একটি অংশে দাঁড়িয়ে আছে। যার নাম কেওক্রাডং ট্যুরিস্ট মোটেল।

বাকি সবগুলো কটেজ প্রায় কাছাকাছি। কটেজে পৌঁছেই অনুভব করতে লাগলাম হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস। হঠাৎ করে দূরে দেখা দিলো চাঁদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই চাঁদ রূপ নিলো পূর্ণিমার চাঁদে। দূরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে থাকা সব মেঘ দৃশ্যমান হয়ে উঠলো চাঁদের আলোয়‌। আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর চাঁদ দেখলাম সেই রাতে।

কিছুক্ষণ পর আমরা গেলাম সেখানকার একমাত্র খাবার হোটেলে। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম এই পাহাড় একজন ব্যক্তি মালিকানাধীন। তার নাম লালা মুন থান বা লালা বম। অনেক বছর ধরে বংশানুক্রমে তিনি এই পাহাড়ের মালিক। কেওক্রাডং এর আশে পাশে প্রায় ২০ বিঘা জমি তার এবং শত বছরের জন্য লিজ নেওয়া। খাওয়া দাওয়ার পর আমরা আবার কটেজে ফিরে গেলাম।

কটেজে গিয়ে দেখলাম সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। গান বাজনা হচ্ছে। রাত যত গভীর হতে থাকলো তত চাঁদের আলো তীব্র হতে থাকলো‌। একটু পরপর চারপাশ মেঘে ঢেকে যাচ্ছিলো।

আহা! কি অপরূপ দৃশ্য! আমাদের ঘুম ভেঙে গেলো ভোরেই। সূর্যোদয় দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকলাম হেলিপ্যাডের সামনে। এতো সুন্দর ভোর আমি জীবনে কখনো দেখি নি। অপরূপ এক সূর্যোদয়! সূর্য যখন পাহাড়ের মাঝ থেকে উঁকি দিচ্ছিলো, তখন চারপাশের সবকিছু যেনো সবুজে ভরে যেতে শুরু করলো।কেওক্রাডং : এক রূপকথার পাহাড়

সবকিছু যেনো আঁধার কাটিয়ে প্রাণ ফিরে পেলো। সূর্যোদয় দেখার পর চলে গেলাম কেওক্রাডং এর সবচেয়ে উঁচু চূড়ার অংশটিতে। সেখানে পাথরে খোদাই করে এর উচ্চতা লেখা আছে। সেখান থেকে ১০ মিনিট দূরেই পাসিং পাড়া যা বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম। পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ হওয়ায় আমরা আর যেতে পারলাম না সেখানে।

পাসিং পাড়া হয়ে যাওয়া যায় জাদিপাই ঝর্ণা আর নাফাখুম, আমিয়াখুমের উৎপত্তিস্থল ৎবলাং (Tlabong) বা ডাবল ফলসে। সকালটা আমরা কেওক্রাডং এই কাটালাম। পরবর্তী গন্তব্য চিংড়ি ঝর্ণা। কেওক্রাডং থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম দার্জিলিং পাড়ায়।

সেখান থেকে গেলাম চিংড়ি ঝর্ণায়। চাইলে চিংড়ি ঝর্ণা দেখেও কেওক্রাডং যাওয়া যায়। এরপর বিকালের আগেই পৌঁছে গেলাম বগালেক পাড়ায়। বর্ষাকাল বা শরৎকাল কেওক্রাডং যাওয়ার আর্দশ সময়। এসময় খুব সুন্দর মেঘ দেখা যায়। এই পাহাড় আমাদের সম্পদ। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও আমাদের। ভ্রমণকালে যেখানে সেখানে প্লাস্টিক, পলিথিন ফেলা উচিত নয়। এতে পাহাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। সকলের ভ্রমণ হোক নিরাপদ ও আনন্দময়।

Thanks For Visit.

Leave a Comment