ইউটিউবের খুঁটিনাটি

ইউটিউবের খুঁটিনাটি (প্রযুক্তি)

 

বর্তমান ইন্টারনেট জগতের বহুল পরিচিত এবং বিশ্বব্যাপী (ব্লকড দেশসমূহ ব্যতীত) পরিবেষ্টিত একটি ওয়েবসাইট হচ্ছে ইউটিউব। ভিডিও শেয়ারিং এর এই ওয়েবসাইটটিতে, মে ২০১৯-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মিনিটে ৫০০ ঘণ্টারও বেশি ভিডিও আপলোড করা হয় এবং প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ঘণ্টারও বেশি ভিডিও দেখা হয়। সিনেমার ট্রেইলার, নানান পণ্যের রিভিউ, দৈনন্দিন খবরাখবর ইত্যাদি অসংখ্য কন্টেন্টের উপর ভিডিও পাওয়া যায় ইউটিউবে। কিন্তু কিভাবে যাত্রা শুরু করেছিলো এই সফল ওয়েবসাইটটি? কিভাবে পেলো এতো জনপ্রিয়তা?ইউটিউবের খুঁটিনাটি (প্রযুক্তি)

আজকের আলোচনায় আমরা উত্তর খুঁজবো এসব প্রশ্নের। সান ব্রুনো, ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক এই মার্কিন অনলাইন ভিডিও-শেয়ারিং সাইটটির যাত্রা শুরু হয়েছিলো ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জাভেদ করিম সেদিন চিড়িয়াখানার সামনে দাঁড়িয়ে আপলোড করেছিলেন “Me at the zoo” নামের ইউটিউবের প্রথম ভিডিওটি। পেপ্যালের তিন প্রাক্তন কর্মচারী চ্যাড হার্লি, স্টিভ চেন এবং জাভেদ করিম মিলে প্রথমে ইউটিউব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি অনলাইন ভিডিও শেয়ারিং সাইট হিসেবে। তখনও কেউ ভাবে নি যে অনলাইন ভিডিও শেয়ারিং এই সাইটটি একদিন পরিণত হবে ভিডিওর এক মহাবিশ্বে। ২০০৬ সালের নভেম্বরে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারে গুগল ইউটিউবকে কিনে নেয়।

নতুন করে শুরু হয় ইউ-টিউবের পথচলা। বিনামূল্যে ব্যবহার, ইউজার ফ্রেন্ডলি ইন্টারফেস এবং সহজে শেয়ার করার সুবিধার পাশাপাশি ইউটিউবের অন্যতম বড় সুবিধা ছিলো কন্টেন্ট মনিটাইজেশন। ২০০৭ সালে ইউ-টিউব পার্টনার প্রোগ্রাম নামে এর সূচনা হয়। কোনো জটিল নিবন্ধন বা আইনি কাগজপত্র ছাড়াই ভিডিও বানিয়ে আপলোড করে যে কেউ রাতারাতি জগৎ বিখ্যাত হয়ে যেতে পারেন এই প্লাটফর্মে। জাস্টিন বিবারের মতো জনপ্রিয় শিল্পীরও কিন্তু শুরুটা হয়েছিলো এই      ইউ-টিউবে ভিডিও আপলোডের মাধ্যমে। কিন্তু ইউ-টিউব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এর এলগরিদমের জন্য।

বর্তমানে গুগলের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন হলো ইউ-টিউব। ডিম ভাজি থেকে শুরু করে গাড়ির টায়ার বদলানো, ক্লাসরুমের পড়াশোনা থেকে যেকোনো মুভির ব্যাখা কি নেই এখানে! আর একবার কোনো বিষয়ে সার্চ করলেই হয়েছে, ইউ-টিউবের সার্চ ইঞ্জিন আপনার পছন্দের বিষয়গুলো একে একে তুলে আনবে হোমপেইজে।

এই এলগরিদম ইউটিউবের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, এর ভূমিকা আছে ইউ-টিউবের ব্যবসাতেও। বর্তমানে ইউটিউব গুগলের অধীনস্থ হলেও, এর প্যারেন্ট কোম্পানির নাম গুগল নয়, এলফাবেট ইন কর্পোরেশন। অনেকেই হয়তো জানেন এলফাবেট গুগলের মাতৃ প্রতিষ্ঠান। গুগলের সব অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ছাদের নিচে আনার উদ্দেশ্যে ল্যারি পেইজ এবং সার্গেই ব্রিন এটি প্রতিষ্ঠা করেন ২০১৫ সালের অক্টোবরে। বর্তমানে এর সিইও বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন সুসান ওজচিকি যিনি যুক্তরাষ্ট্রের একজন ব্যবসায়ী এবং এর সদরদপ্তর ৯০১ চেরি এভিনিউ, স্যান ব্রুনো, ক্যালিফোর্নিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত।ইউটিউবের খুঁটিনাটি (প্রযুক্তি)

ফেইসবুকের পর ইউটিউব এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া। আমাজন.কম অধীনস্থ একটি ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক মার্কিন র‍্যাংকিং কোম্পানি, অ্যালেক্সা ইন্টারনেট, অনুসারে আগস্ট ২০১৮ এর হিসাব অনুযায়ী গুগলের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় সাইটটি হচ্ছে ইউটিউব।

প্রতি মাসে ২ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ ইউটিউব ব্যবহার করেন। এলফাবেট ইন কর্পোরেশনের ৯.৪% লভ্যাংশ আসে ইউটিউবের বিজ্ঞাপন থেকে। ২০২০ সালে ইউটিউবে আয় হয়েছে ১৯.৮ বিলিয়ন ডলার। আর এর সবকিছুর পিছনেই আছে ইউ-টিউবের এলগরিদম যা, সঠিক দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে প্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপন। নেটফ্লিক্স, এমাজন প্রাইম বা হুলুর মতো স্ট্রিম সার্ভিসগুলোর সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে ২০১৪ সালের নভেম্বরে ইউ-টিউব লঞ্চ করে ইউ-টিউব রেড। ২০১৮ সালের মে তে এর নাম বদলে রাখা হয় ইউ-টিউব প্রিমিয়াম। অরিজিনাল মুভি, সিরিজ ইত্যাদি দেখার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ছাড়াই দর্শকরা ইউ-টিউব চালাতে পারেন ইউ-টিউব প্রিমিয়ামে।

ইউ-টিউবের বর্তমানে মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ ব্যবহারকারীদেরকে আরও বেশি সুবিধা দেওয়া। একদিকে ব্যবহারকারীরা ভিডিও আপলোড দিচ্ছেন, আরেকদিকে খুঁজে দেখছেন প্রয়োজনীয় ভিডিও। এখানে বেশিরভাগ ভিডিও ব্যক্তিগতভাবে আপলোড করা হলেও, হুলু, ভেভো, বিবিসি এবং সিবিএস সহ মিডিয়া কর্পোরেশনগুলো ইউ-টিউব অংশীদারিত্বের প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে তাদের কিছু নিজস্ব ভিডিও ইউ-টিউবের মাধ্যমে সরবরাহ করে থাকে। ভিডিও দেখার পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা ভিডিও মূল্যায়ন করতে পারেন লাইক বা ডিসলাইক অপশনের মাধ্যমে।

এছাড়া, ভিডিওগুলো নিজে দেখার পাশাপাশি আরেকজনকে দেখানোর জন্য রয়েছে শেয়ার অপশন। ভিডিওগুলোকে সহজেই খুঁজে পাওয়ার সুবিধা হিসেবে আছে চালনতালিকায় বা প্লেলিস্টে যুক্ত করার অপশন। এছাড়া, খারাপ বা ভায়োলেন্ট টাইপের ভিডিওগুলোতে রয়েছে অভিযোগ বা রিপোর্ট করার মতো অপশন। কমেন্ট বা মন্তব্য করার মতো সুবিধাও আছে প্রত্যেক ভিডিওতে।

ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন সম্প্রচারকেন্দ্রের বা চ্যানেলের গ্রাহক হতে পারেন সাবস্ক্রাইব অপশনের মাধ্যমে। এর ফলে সেই সম্প্রচারকেন্দ্র বা চ্যানেলটি নতুন কোনো ভিডিও আপলোড করলে ব্যবহারকারী সাথে সাথেই নোটিফিকেশন পাওয়ার মাধ্যমে অবগত হন। ফলে ব্যবহারকারী সাথে সাথেই দেখতে পারেন ভিডিওটি। এছাড়া, এখানে প্রায় প্রত্যেকটা ভিডিওর রেজ্যুলেশন হয়ে থাকে ১৪৪ পিক্সেল থেকে শুরু করে ১০৮০ পিক্সেল পর্যন্ত। ফলে, ব্যবহারকারী তার পছন্দমতো ভিডিও কোয়ালিটি নির্বাচন করে দেখতে পারেন। সেই সাথে রয়েছে সাবটাইটেলের সুবিধা। ব্যবহারকারী ভিডিওর কথাগুলো বুঝতে না পারলে, সাবটাইটেলের মাধ্যমে সহজেই এই সমস্যার সমাধান করা যায়। এছাড়া, প্লেব্যাক স্পিড অপশনটির মাধ্যমে ভিডিওটি দ্রুত কিংবা আস্তে আস্তে দেখার সুবিধাও আছে ইউ-টিউবে।ইউটিউবের খুঁটিনাটি (প্রযুক্তি)

এছাড়া, ভিডিওগুলো ভিআর (VR) এ দেখার সুবিধাও রয়েছে। ফলে, ব্যবহারকারীরা থ্রিডি (3D) তে ভিডিওগুলো উপভোগ করতে পারেন। সেই সাথে তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপন। বর্তমানে ১০০টির বেশি দেশে, ৮০টি ভাষায় ইউ-টিউব এখন প্রচলিত। একদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইউ-টিউব ব্যবহার করছে নিজেদের পণ্য ও সেবার এই ব্যাপারে মানুষকে জানাতে। অন্যদিকে মানুষ ইউ-টিউবে আসছে নতুন জ্ঞান অর্জন কিংবা বিনোদনের খোরাক মেটাতে। এভাবেই প্রতিদিন আরও বাড়ছে ইউ-টিউবের পরিসর। যে ইউ-টিউবের শুরু হয়েছিলো ভিডিও শেয়ারিং সাইট হিসেবে, আজ তা পরিণত হয়েছে বিজ্ঞাপনদাতাদের হলি গ্রেইলে।

Thanks For Visit.

Leave a Comment