অপারেশন ট্রোজান শিল্ড-2019

অপারেশন ট্রোজান শিল্ড

 

এফবিআই-এর ফাদে একযোগে ৮০০ অপরাধী! যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (FBI)এর নাম শুনেছেন অনেকেই।শুরুতে কাগজে কলমে তাদের কাজের ক্ষেত্র যুক্তরাস্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তারা সারা বিশ্বেই অন্যান্য দেশের গোয়েন্দা ওপুলিশ সদস্যদের সাথে হাত মিলিয়ে অপরাধী পাকড়াওয়ে ভুমিকা রাখছেন।বিশ্বব্যাপী গত ৮ জুন এফবিআই এর নেতৃত্বে একটি স্ট্রিং অপারেশনে একযোগে ১৬টি দেশের ৮০০ অপরাধী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে!আরো কয়েক হাজার আসামি ধরা পরা সময়ের ব্যাপার শুধু।

লাইফ উইথ স্টাইলের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হবে আজ সম্প্রতি বহুল আলোচিত ‘অপারেশন’ ট্রোজান শিল্ড’এর বিস্তারিত ঘটনা। স্টিং অপারেশন মনে করুন,একজন লোক মাদকদ্রব্য বিক্রি করে।পুলিশ বিষয়টি জানে কিন্তু তথ্য প্রমানের অভাবে লোকটিকে ধরতে পারছে না।এমতাবস্থায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিজেরাই ক্রেতা সেজে তাকে হাতে নাতে গ্রেফতার করে সুযোগ বুঝে।বিশ্বের সব দেশেই এভাবে ফাঁদ পেতে অপরাধি ধরার কাজ হয়ে থাকে।

তবে এফবিআই-এর কাজের ধরন ভিন্ন।তারা সম্ভাব্য অপরাধীকেউ(যারা অপরাধ করেনি কিন্তু অপরাধ করতে আগ্রহী)তাদেরকেউ ফাঁদে ফেলে প্রমান সহ হাতে নাতে গ্রেফতার করে।যেমন পৃথক ঘটনায় কয়েক বছর আগে প্রবাসী ২ বাঙ্গালি যুবককে গ্রেফতার করা হোয় যুক্তরাস্ট্রে।জঙ্গীবাদে আকৃষ্ট হতে দেখে অনলাইনে নজরদারি করে স্টিং অপারেশনের ফাঁদ পাতে এফবিআই।তাদের একজনকে(বাতিল)সহায়তা করে অস্ত্র ও গ্রেনেড কিনতে সহায়তা করে এক ছদ্মবেশি এজেন্ট।এক্সপ্লোসিভ ডিলার সাজিয়ে আর এক এজেন্টকে ওই যুবককে অকেজো বিস্ফরোক সরবারহ করা হয়।

যখন তারা অপরাধ সংগঠন করতে যায় পুলিশ তনই তাদের গ্রেফতার করে হাতে নাতে।মূলত এ ধরনের অপারেশনকে বলা হয় স্টিং অপারেশন। অর্থাৎ সম্ভাব্য বা প্রকৃত অপরাধিদের প্রথমে অপরাধ করতে সহায়তা করা এবং পরে প্রমান সহ তাদেরকে গ্রেফতার করাই অপারেশনের মূল উদ্যেশ্য। তোন ব্যাক্তিকে অপরাধ কারার আগেই ফাসিয়ে দেওয়া হয় বিধায় স্টিং অপারেশন নিয়ে বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা হয়ে থাকে।ক্ষেত্রবিশেষে এটি নেতিবাচক হলেও সব ক্ষেত্রে সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক নয়। ফিলিপাইন নিদৃষ্ট ধরনের(যেমন ড্রাগ ডিলার সেজে মাদক বিক্রি করা)স্ট্রিং অপারেশনকে ঘোষণা করা হয়েছে অবৈধ্য হিসেবে।স্টিং অপারেশনে এছাড়া আরো কয়েকটি ধরন রয়েছে।যেমন-পলাতক অপরাধিকে ভ্রমনের বিমান টিকেট,গাড়িচোরকে বিলাশ বহুল গাড়ির টোপ দেওয়া।অপারেশন ট্রোজান শিল্ড

হ্যাকারদের সুন্দরী নারীর লোভ দেখিয়ে বাস্তব জীবনের পরিচয় বের করা।অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে মদ গাঁজা বিক্রির প্রলোভন দেখানো।শিশু যৌন নীপিড়নকারীদের জন্য অনলাইন চ্যাট রুমে টোপ ফেলা,অবৈধ দেহব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাস্টমার সেজে হানা দেয়া ইত্যাদি। ট্রোজান শিল্ড এমন একটি স্টিং অপারেশন যেখানে অপরাধিদের শতভাগ নিরাপদ ম্যাসেজিং আশ্বাস দিয়ে বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে স্পুফিং আ্যাপ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।এর মাধ্যমে সার্বক্ষনিক কাদের নজরদারি করা সম্ভব হয়েছিলো। ডিজিটাল নজরদারি কারো উপর নজরদারি করা আজকের এই ডিজিটাল যুগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বেশ সহজ হয়ে গেছে।আপনার ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য অপনার আজান্তেই চুরি করা সম্ভব।

স্মার্টফোন ল্যাপটপের ক্যামেরা স্পিকারের ক্যামেরা নিয়ন্ত্রন আপনার অজান্তে নেওয়াও অসম্ভব কিছু না।তবে সাধারনত ডিভাইস ব্যবহারে অপরাধিরা সতর্কতা অবলম্বন করে।নিজেদের মধ্যে তারা যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড ডিভাইস বা’এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন সুবিধা সম্পন্ন ম্যাসেজিং অ্যাপ/সফটওয়ার ব্যাবহার করে থাকে।এই ডিভাসগুলো ক্রাক বা গোপন তথ্য উদ্ধারে ম্যাসেজ হ্যাক করা বেশ কঠিন। যেমন-বহুল পরিচিত হোয়াটস অ্যাপ বা টেলিগ্রামে এনক্রিপশন পদ্ধতি আছে।সুতরাং(ডেভলোপারদ্র দাবি অনুযায়ী)এর ম্যাসেজ গুলো আদান প্রদানের সময় মাঝ পথে ইন্টারসেপ্ট করে পড়ে ফেলা সম্ভব নয়।এছাড়া ব্ল্যাকবেরি আইফোনের মতো আধুনিক ফোন গুলোর নিরাপত্তা ব্যাবস্থা খুবই শক্তিশালী হওয়ায় প্রশাসনের দক্ষ আইটি এক্সপার্টদের জন্যউ এগুলো ক্রাক করা কস্টসাধ্য বিষয়।অপারেশন ট্রোজান শিল্ড

এরপরও অপরাধিদের কাছে এসব অ্যাপ বা ডিভাইস শতভাগ নিরাপদ নয়।প্রসাশনের কাছে অ্যাপ নির্মাতা তথ্য ফাঁস করে কিনা তা জানার সুযোগ ব্যবহারকারীদের নেই।এফবিআই কয়েক বছর আগে অ্যাপোলের কাছে এক অপরাধির আইফোন ক্রাক করতে সাহায্য চেয়ে প্রত্যখ্যাত হয়েছিলেন।কিন্তু তারা থার্ড পার্টির সাহায্য নিয়ে ঠিকই সম্পন্য করেন নিজেদের কাজ।অর্থাৎ স্মার্টফোনগুলো আধুনিক হলেও অপরাধীদের কাছে শতভাগ নিরাপদ নয়। ফ্যান্টম সিকিউর: এটি একটি কানাডিয়ান কম্পানি যারা মডিফাইড এনক্রিপ্টেড ফোন বানাতো।ভিনসেন্ট রামোসে এর মালিক কুখ্যাত মেক্সিকান মাফিয়া সংগঠন’সিনালোয়া কার্টেল এর খাতির ছিলো।কার্টেলের মাদক পাচারকারীদ্র যোগাযোগের সুবিধার্থে’ফ্যান্টম সিকিউর’ফোন তৈরি করেন তিনি।

২০১৮ সালের মার্চে তিনি বিশেষ কাজে কানাডার ব্রিটিশ কলোম্বিয়া থেকে ওয়াশিংটনে আসেন।এফবিআই খবর পেয়ে তার উপরে স্টিং অপারেশন পদ্ধতি চালু করে।এমন ধরনের এনক্রিপ্টেড ডিভাইস বানানো ও সেটার বিক্রি আইনে মোটেউ অন্যায় নয়।রামোসকে তাই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।কিন্তু তার কাছে যাওয়া তার ক্লাইন্ট আন্ডারকভার এজেন্টের কাছে তিনি স্বীকার করেন যে তিনি এই ডিভাইস তৈরি করেছেন মাদক পাচারকারীদের জন্য।

ব্যাস এবার এফবিআই প্রমান সাপেক্ষে অডিও ভিডিও সহ তাকে আটক করে। আইনের ফাঁদ হাত থেকে বাঁচতে বাধ্য হন নিজের ফ্র্যান্টম সিকিউর এর এডমিন লগইন ডিটেইলস হস্তান্তার করতে।এফবিআইয়ের আইটি এক্সপার্ট ফ্র্যান্টম সিকিউরের পুরো কন্ট্রল হাতে পেলেও জানতে পারেনি ক্লায়েন্টদের পরিচয় সম্পর্কে ডিটেলস।ডিভাইসটি রামোস এমন ভাবে ডিজাইন করেছেন যেন গ্রাহকদের তথ্য প্রকাশ না পায়। তাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে ডাবল এজেন্ট খুঁজে পাই নিজেদের ভিতর একজন।ক্যামেরন আর্টিস তথ্য পাঠাতেন ফ্যান্টম সিকিউরের কাছে।অপারেশন ট্রোজান শিল্ড

আর্টিস ছিলেন কানাডার পুলিশের স্পেশাল ব্র্যান্চ’ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টার(NICC)এর ডিরেক্টর জেনারেল! ২০১৯ সালে নয় বেছরের কারাদন্ড দেওয়া হয় ভিনসেন্ট রামোসকে।এফবিআই কর্মকর্তারা তার সাজা মওকুফ করে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে অফার দেয় একটি ফ্যান্টম সিকিউর সিস্টেমে ব্যাকডোর তৈরি করে দেওয়ার।অর্থাৎ ব্যাবহারকারীর ম্যাসেজ আদান প্রদানের তথ্য এফবিআই-এর কাছে পৌছানোর জন্য পুরো সিস্টেমে একটি ব্যাবস্থা তৈরি করে দেওয়া। কিন্তু রামোস এই কাজে কোন ভাবে রাজি হয়নি।তাকে প্রলোভন দেওয়া হয় এফবিআইয়ের কাস্টডিতে নেওয়ার।অর্থাৎ তার নাম ঠিকানা পরিবর্তন করে নতুন জীবনের ব্যাবস্থা করা।

কিন্তু রামোস জেলে যাওয়াই তার থেকে ভালো মনে করলো। এফবিআইকে সাহায্য করলে মেক্সিকান মাফিয়ারা শেষ করে দিবে তার সমস্ত পরিবারকে।এমনকি জেলের মধ্যে তাকে খুন করা কার্টেলের জন্য অসম্ভব কিছু নয়।একটি অ্যাপ বন্ধ করলে যেহেতু তার জায়গা দখল করে অন্য অ্যাপ,তাহলে তারা কেন নিজেরাই এমন অ্যাপ বানাচ্ছে না।সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হবে তাদের অ্যাপ।নিরাপদ মনে ব্যাবহার করবে সকল শ্রেনীর অপরাধি।

Thanks For Visit.

Leave a Comment