অতিরিক্ত মাইন্ডফুলনেস চর্চা যখন শঙ্কার কারণ

অতিরিক্ত মাইন্ডফুলনেস চর্চা যখন শঙ্কার কারণ

দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, আতঙ্ক ইত্যাদি সমস্যার সমাধান হিসাবে মাইন্ডফুলনেস চর্চা বর্তমানে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। মাইন্ডফুল ব্রিদিং আর মাইন্ডফুল বডি এওয়ারনেস হচ্ছে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সহজ পন্থা। মাইন্ডফুল ব্রিদিং পদ্ধতি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের শুধুমাত্র জন্য শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মনোযোগ প্রয়োগ করা। প্রশ্বাসের সময় প্রবেশকৃত বাতাসের শীতলতা, বুক ও তলপেটের ফুলে ওঠা এবং নিশ্বাসের সময় বেরিয়ে যাওয়া বাতাসের উষ্ণতা, বুক ও তলপেটর নিচে নেমে যাওয়ার অভিজ্ঞতার উপর মনোযোগ প্রদান করাই হলো মাইন্ডফুল ব্রিদিং পদ্ধতি।

অন্যদিকে শারিরীক অনুভূতির নন জাজমেন্টাল এক্সপেরিয়েন্সিং হলো মাইন্ডফুল বডি এওয়ারনেসের মূল প্রক্রিয়া। অর্থাৎ নীরব কোনো স্থানে শুয়ে বা বসে শরীরের কোথায় কি হচ্ছে সেগুলোকে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখানো ছাড়াই শুধুমাত্র মাত্র অনুভব করা। যেমন : শরীরের কোনো স্থানে টান লাগা, শিরশির লাগা, চুলকানো, কোনো ব্যাথা অনুভব করা ইত্যাদি। মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশনের অন্যতম উপকারিতা হলো বর্তমানে থাকতে শেখানো। অতীতের ঘটনা বা আক্ষেপ কিংবা ভবিষ্যতের ব্যাপারে চিন্তার চাপ থেকে রেহাই দিয়ে বর্তমানে কি হচ্ছে সেদিকে মনোনিবেশ করা হয়। বর্তমানে এর জনপ্রিয়তা অনেক ঊর্ধ্বমুখী হবার পরেও সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এর কিছু ক্ষতিকর দিক উঠে আসে।

২০১৯ সালে একাধিক মহাদেশ থেকে ১৩২২ জন নিয়মিত মেডিটেটরদেরকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করা হয়। উক্ত সমীক্ষায় ২৫.৬% অর্থাৎ ৩১৫ জন মেডিডেটর মেডিটেশনকালে অথবা মেডিটেশনের পর বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক অনুভূতির সম্মুখীন হয়েছেন। অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকের বেশি (৫৩.৬%, ৬০০ জন) ছিলেন নারী। এর মধ্যে ৬১.৪% বা, ৭৫৬ জন নিয়মিত ধর্মচর্চা করেন এবং ৭৩% অর্থাৎ, ৮৯৯ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, অস্থিরতা, নেতিবাচক চিন্তা, ভয় ইত্যাদি ছিলো উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক অনুভূতি। মেডিটেশন বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে।

যেমন : ডিকন্সট্রাক্টিভ, নন-ডিকন্সট্রাক্টিভ, এটেনশন্যাল ইত্যাদি। এগুলোর প্রতিটিই মূলত একদম অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে মেডিডেটরদের বর্তমানে উপস্থিত থাকতে শেখায়।মানুষ বর্তমানে বাস করলেও চিন্তা চেতনার জগতে হয়তো অতীতের কোনো ঘটনার দ্বারা তাড়িত হয়, কিংবা ভবিষ্যতের চিন্তায় মগ্ন থাকে। এভাবে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে।অতিরিক্ত মাইন্ডফুলনেস চর্চা যখন শঙ্কার কারণ

তখন মাইন্ডফুলনেস চর্চার মাধ্যমে অতীত কিংবা ভবিষ্যতের জগৎ থেকে মুক্তি অর্জন করতে পারে। অতীতে যা ঘটেছে তা তো ঘটেই গিয়েছে। মানুষের কোনো সাধ্য নেই অতীতকে বদলানোর। আবার ভবিষ্যতেও এমন কিছু ঘটবে, এর কোনো নিশ্চয়তাও নেই। মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরের এই দুই সময় বাদে মানুষ যে সময়টাতে বাঁচে, যে বাস্তবতায় তার অস্তিত্ব বিদ্যমান, সেটিকে স্বীকার করার (acknowledge) মাধ্যমে মস্তিষ্কের উন্নয়ন করা সম্ভব। সম্প্রতি মেডিটেটরদের মস্তিষ্কের স্ক্যান করে দেখা গিয়েছে যে, তাদের মস্তিষ্কের ইনসুলা কর্টেক্স স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত।

মস্তিষ্কের এই অংশটি শারীরবৃত্তিক অনুভূতি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে সম্পর্কিত। শারীরবৃত্তীয় সচেতনতাবোধ হলো মাইন্ডফুলনেস চর্চার একটি পদ্ধতি। অর্থাৎ, মাইন্ডফুলনেস চর্চার সময় শরীরের প্রতিটি স্থানে কখন কেমন সাড়া পাওয়া যায়, তার প্রতি গভীর মনোযোগী হওয়া। এর ফলে মেডিডেটর বিভিন্ন স্নায়বিক প্রক্রিয়ার (emotions) মাধ্যমে তার শরীরে সৃষ্ট অনুভূতিসমূহ (feeling) প্রতি আরও ভালো ভাবে অনুভব করতে পারেন। আস্তে আস্তে এই স্কিলটি আয়ত্ত করতে পারলে, মেডিডেটর বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তবে, অনেকের ক্ষেত্রে মেডিডেটশনের যে অত্যানুকূল মাত্রা আছে তা অতিক্রম করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আরেক গবেষণায় মেডিটেটরদের মাঝে কিছু নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে।

অতিরিক্ত মাইন্ডফুলনেস চর্চা যখন শঙ্কার কারণকিছু কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ডরসোল্যাটেরাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে মেডিটেশন, যা মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম এবং অ্যামিগডালাকেও প্রভাবিত করে থাকে। অ্যামিগডালা মানুষের আবেগ, অনভূতিসমূহকে প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক উপায়ে মেডিটেশন করার ফলে লিম্বিক সিস্টেমের উপর ডরসোল্যাটেরাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণ ভারসাম্য থাকে। ফলে মেডিটেটরের মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং আবেগের প্রতি তার প্রতিক্রিয়াকে সে সফলতার সাথে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। যদি সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তাহলে অ্যামিগডালা এই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে, সম্পূর্ণভাবে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক সকল অনুভূতিগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে।

ফলে, মেডিটেটররা তখন কোনো চূড়ান্ত অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। ফলে, তাদেরকে কোনোকিছুই আর বিচলিত করতে পারে না। না তারা অত্যন্ত খুশি হয় কোনো ঘটনায়, না তারা মারাত্মকভাবে হতাশা বা দুঃখে ভোগেন কোনো পরিস্থিতিতে। সম্প্রতি আরেক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, ঘুম আনার ক্ষেত্রে মেডিডেটশন কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাহায্য করলেও, এর বিপরীত ঘটনাও ঘটেছে। মাইন্ডফুলনেস একটি কোর্সের আয়োজন করা হয়েছিলো, যার পরিসীমা ছিলো ৮ সপ্তাহ।অতিরিক্ত মাইন্ডফুলনেস চর্চা যখন শঙ্কার কারণ

প্রতি সপ্তাহে ৫ দিনে যারা অন্তত ৩০ মিনিটের জন্য মেডিটেশন করেছিলেন, তারা সকলেই ঘুমের সমস্যায় ভুগেছেন। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম সময়ের জন্য যারা মেডিটেশন করেছিলেন, তাদের ঘুমের মান এবং সময় উভয়ই ঠিক ছিলো। ক্যাফেইন, কোকেইন, রিট্যালিন ইত্যাদি মনোযোগ বৃদ্ধিকারী রাসায়নিক দ্রব্যগুলো কিছু সময়ের জন্য মানুষের মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে। এই ওষুধ বা রাসায়নিক দ্রব্যগুলোর কার্যকারিতা যতক্ষণ বজায় থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত এসবের প্রভাবে মানুষের মস্তিষ্ক অধিক পরিমাণে মনোযোগী এবং সতর্ক থাকে। একইভাবে মেডিটেশনও এক পর্যায়ে সক্ষম মানুষের মস্তিষ্কে একই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। পরিমিত মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে মেডিটেশন করার ফলে, মস্তিষ্ক অতিরিক্ত সজাগ ও সতর্ক হয়ে ওঠে।

তখন মস্তিষ্কের দায়িত্ব বৃদ্ধি পায় এবং সে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে, ঘুমের জন্য মস্তিষ্কের যে আরামদায়ক অবস্থার প্রয়োজন হয়ে থাকে, তা থেকে সে বঞ্চিত হয়। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই মানুষ তখন ঘুমাতে ব্যর্থ হয়। আগে মেডিডেটশন নিয়ে সকলের একচেটিয়া ধারণা থাকলেও বর্তমানে উন্নত গবেষণার কারনে এর নেতিবাচক দিকগুলোও ফুটে উঠেছে। তবে, মেডিডেটশনের নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে এর কার্যকারিতা বৃদ্ধির উপরই এখন গবেষণার বিষয়।

Thanks For Visit.

Leave a Comment